ব্যবসায় গড়ুন ক্যারিয়ার

মোশারফ হোসেন সুমন। চাঁদপুর জেলার, ফরিদগঞ্জ থানার রূপসা বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো business-schoolব্যবসা কী? উত্তর দিলো সততা ও দক্ষতা। অর্থাৎ সততা ও দক্ষতার সাথে যে কোনো পণ্য কেনা-বেচা। এ ব্যবসাই ছিল আদিম মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ। যখন কোনো পেশার আবিষ্কার হয়নি মানুষ তখন ব্যবসা করতো। অবশ্য ব্যবসার ধরন ছিল ভিন্ন। মূদ্রা এখনো হাতে আসেনি মানুষের। মানুষ পরস্পরে পণ্য বিনিময় করতো। এর মাধ্যমে শুরু ব্যবসা। মূদ্রা আবিষ্কৃত হলো। মানুষের জীবন ধারা উন্নত হলো। ব্যবসাও তার রূপ পাল্টালো। দিন দিন ব্যবসা তার পরিধি বাড়িয়েছে। বেড়েছে ব্যবসার ব্যাপকতা। সম্মান আর মহৎ পেশা হিসেবে ব্যবসার স্থানও অনেকের কাছেই প্রথম। স্বাধীনভাবে অন্যের অধীনে না থেকে জীবন পরিচালনা সত্যিই আনন্দের যা সম্ভব ব্যবসার মাধ্যমে। আজকের বিষয় ব্যবসা নিয়েই। লিখেছেন : এসএম মাহফুজ

ব্যবসা কী

ব্যবসার সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করেছিলাম কয়েকজন ব্যবসায়ীকে। তাদের উত্তর ছিলো ব্যবসা কী আবার? ব্যবসা, ব্যবসাই। business-report-titleব্যবসায়ীরা ব্যবসাকে সংজ্ঞায়িত সেভাবে না করতে পারলেও, সংজ্ঞায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যবসায় (BBA) যারা পড়াশোনা করছেন তারা ব্যবসা শব্দকে দেখছেন ব্যবসায় হিসেবে। যার ইংরেজি Business আক্ষরিক অর্থে ব্যস্ত থাকা। অর্থাৎ যারা কেনা-বেচায় ব্যস্ত।
ব্যবসায় প্রশাসনে বিশেষজ্ঞ ওয়াই.কে.ভুষান (Y.K.Bhushan) ব্যবসার সংজ্ঞা বলেছেন- ব্যবসা বলতে পণ্য দ্রব্যের সংগঠিত উৎপাদন বা বিক্রয়ের কাজকে বুঝায় যা মানুষের অভাব পূরণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়। ব্যবসাকে যে যেভাবেই দেখুন ব্যবসা হলো মানুষের জীবন ধারনের উদ্দেশ্যে পণ্য দ্রব্যের বেচা-কেনা।

ব্যবসার ধরন

ব্যবসার বিচিত্র ধরন বিদ্যমান। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যেসব ব্যবসা জড়িত সেগুলো হলো-
মুদির দোকান:
মুদি দোকানে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী থাকে। চাল, ডাল, তেল, লবণ, সাবান, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থাকে মুদি দোকানে। বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেকটি মানুষকেই ধরনা দিতে হয় মুদি দোকানে।
ফার্মেসী :
একজন ভালো মানুষ কখন যে অসুস্থ তার কোনো হিসাব নেই। গ্রাম-গঞ্জে অসুস্থ হলেই মানুষ প্রথমে যায় ফার্মেসীতে। ফার্মেসীতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ঔষধ বিদ্যমান থাকে। যিনি ফার্মেসী দেন তাকেও রোগ এবং রোগী সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়।
কাপড়ের দোকান :
আমাদের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে বস্ত্র অন্যতম। এজন্য কাপড়ের দোকানও গুরুত্বপূর্ণ। কাপড়ের দোকানে সবধরনের কাপড় থাকবে। পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষেরই পোশাক এখানে পাওয়া যাবে।
বইয়ের দোকান :
আমাদের শিক্ষার জন্য চাই বই। তাই বইয়ের দোকান প্রত্যেকেরই চাহিদা মেটাবে। এখানে শুধু বইই থাকবে না। সংশ্লিষ্ট খাতা, কলম ইত্যাদি সবই থাকবে।
এছাড়াও আরো যে ধরনের দোকান হতে পারে, তাহলো-

  • মোবাইল, কম্পিউটার।
  • কসমেটিক্স সামগ্রীর দোকান।
  • হার্ডওয়ার (টিন)।
  • স্বর্ণের দোকান।
  • ফাস্টফুডের দোকান।
  • টেইলার্স।
  • ফার্নিচারের দোকান।
  • আড়তদার।

ব্যবসার প্রচার :

কথায় বলে প্রচারেই প্রসার। আপনি ব্যবসা দিয়েছেন। আপনার প্রতিষ্ঠানটির প্রচারের প্রয়োজন আছে। এ প্রচার স্থানভেদে বিভিন্ন হতে পারে। আপনি প্রতিষ্ঠান উদ্ধোধনের সময় প্রতিষ্ঠানের আশেপাশের সকল ব্যবসায়ী, ঐ এলাকার গণ্যমান্য সবাইকে দাওয়াত দিয়ে দুরূদ শরীফ পড়ানোর মাধ্যমে উদ্ধোধন করুন এটা বিশাল প্রচার। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন নেই। তবে স্থানীয় পত্রিকায় দেয়া যেতে পারে। প্রচারের জন্য আপনার নিজস্ব পরিচিতি অনেক কাজ দেবে। এ ছাড়া দোকানের সামনে সাইনবোর্ড লাগাতে পারেন। প্রয়োজনে লিফলেটও ছাপতে পারেন।

ব্যবসার বিভাগ ও পরিধি

ব্যবসাকে তার কার্যপরিধি অনুযায়ি চারটি বিভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো-

  • শিল্প
  • বাণিজ্য
  • শিল্প বাণিজ্যের সহায়ক কার্যাবলি
  • প্রত্যক্ষ সেবাকর্ম

শিল্প
* শিল্প হচ্ছে ব্যবসায় সর্বোচ্চ পর্যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এর কাজ পরিচালিত হয়। এতে অনেক জনশক্তির প্রয়োজন যেমন: গার্মেন্টস শিল্প।
বাণিজ্য
ছোট পর্যায়ে নিজস্ব দোকান কিংবা নিজস্ব উপায়ে পণ্যের কেনা-বেচাই বাণিজ্য। যেমন: মুদি দোকান।
শিল্প বাণিজ্যের সহায়ক কার্যাবলি
শিল্প এবং বাণিজ্যকে আরো উন্নতির লক্ষ্যে কাজ। যেমন: পণ্য গবেষণা, বাজার গবেষণা।
প্রত্যক্ষ সেবাকর্ম
ব্যাপকভাবে এটি ব্যবসার অন্তর্ভূক্ত। যেমন: আমাদের ডাক্তারি, শিক্ষকতা ইত্যাদি পেশা। আজ আমাদের মূল ফোকাস হচ্ছে বাণিজ্যে। অর্থ্যাৎ সাধারণ যে কোনো ব্যবসা।

ব্যবসার প্রাথমিক প্রস্তুতি

SWOT অ্যানালাইসিস :
কোনো কাজের আগে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে তার একটি কার্যকর ফর্মুলা হলো SWOT অ্যানালাইসিস। এই ফর্মুলার মূল চারটি উপাদানের আদ্যক্ষর হলো SWOT-এর পূর্ণ রূপ হলো S= Strength (শক্তি), W= Weakness (দুর্বলতা), O= Opportunity(সুযোগ) এবং T= Threat । ব্যবসায় নামার আগেও আপনাকে SWOT অ্যানালাইসিস করা দরকার।
মূলধন :
ব্যবসার জন্য মূলধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মূলধন ছাড়া ব্যবসার চিন্তা অসম্ভব। মূলধনের পরিমাণ নির্ভর করবে আপনি কি ধরনের দোকান, প্রতিষ্ঠান দেবেন তার ওপর। আবার এর পরিমাণ স্থান ভেদেও পার্থক্য হবে। এছাড়া আপনি কেমন মুনাফা চান সেটা আপনার মূলধনের উপরই নির্ভর করবে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আপনাকে স্থানভেদে ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নিয়ে নামতে হবে।
ট্রেড লাইসেন্স :
আপনাকে ব্যবসা করতে হবে বৈধ ভাবে। বৈধ ব্যবসার জন্য আপনার চাই ট্রেড লাইসেন্স। আপনি যেখানে ব্যবসা করতে চান। যেকোন ধরনের ব্যবসা করতে চান আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স করতে হবে। সিটি করপোরেশনের আওতায় যারা তাদের লাইসেন্স করান সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। জেলা কিংবা থানা সদরে সেটি পৌরসভার কর্তৃপক্ষ করান। আবার ডিসি অফিসগুলোও অনেক সময় ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে থাকে। ট্রেড লাইসেন্স করতে প্রথমত বেশি টাকা না লাগলেও নানা জটিলতায় বর্তমানে তা করতে ন্যূনতম ৫,০০০ হাজার টাকা লাগবে। একবার ট্রেড লাইসেন্স করালে বছর বছর তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়।
স্থান নির্বাচন :
ব্যবসা শুরুর আগে স্থান নির্বাচন করুন। স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনাকে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। আপনার মূলধন কেমন। আপনার পরিচিতি কোথায় বেশি। জনসমাগম বেশি কোথায়। আপনার ইচ্ছে কোথায় ব্যবসা কারার ইত্যাদি। দোকান ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে শহর হলে আপনাকে এ্যাডভান্স টাকা প্রদানের কথা ভাবতে হবে। গ্রাম এলাকায় বা থানা লেভেলে আপনাকে এ্যাডভান্স হয়তো ২০ থেকে ৮০ হাজার দিতে হবে। সেটা শহরে এসে হয়ে যাবে ২ লাখ থেকে ৮ লাখ। স্থান নির্বাচনে আপনার নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া যে স্থানটি যে ব্যবসার উপযোগী সেখানে সে ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই দিতে হবে।

সফল ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্য

ব্যবসায়িক জ্ঞান :
ব্যবসায় আপনাকে সফল হতে হলে আপনার ব্যবসায়িক জ্ঞানের প্রয়োজন অত্যধিক। কোন পণ্যটা কখন কিনে আপনার মুনাফা বেশি হবে। গ্রাহক কোন জিনিসটা বেশি চাচ্ছে সেটি আপনাকে বুঝতে হবে। আপনি যাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করবেন তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকতে হবে। ব্যবসার বাজার বুঝতে হবে। ভবিষ্যতে কোন পণ্যটির চাহিদা বাড়বে সেটিও আপনার জানতে হবে। এছাড়া প্রত্যেকটি পণ্য কেনার আগে তা ভালো কিনা যাচাই করে কিনা আবশ্যক।
সততা :
একজন সফল ব্যবসায়ীর অন্যতম গুণ হলো সততা। ভেজাল পণ্য বিক্রির কথা ভাবাটাই ব্যবসায়ীর অন্যায়। ব্যবসায়ীর সততা দেখে যেন গ্রাহকরা তার কাছে ভিড় করে। পচাঁ, নষ্ট পণ্য কখনোই বিক্রি করতে নেই। ভালো জিনিস এবং ওজনে সঠিক মাফ যাতে গ্রাহক পায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
পরিশ্রমের মন মানসিকতা :
ব্যবসায় সফলহতে হলে অবশ্যই আপনাকে পরিশ্রমী হতে হবে। প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। আপনার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে নিজের সন্তানের মত ভালোবাসতে হবে। প্রতিষ্ঠানে যখন যেটা প্রয়োজন তৎক্ষণাত সেটা পূরণ করতে হবে। প্রথম প্রথম বেশি মুনাফা না হলেও ধৈর্যের সাথে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে লোকসান হলেও মাথা ঠিক রেখে পরবর্তী কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। আপনার প্রতিষ্ঠান যেন বন্ধ না হয়ে যায়, সতর্ক থাকবেন।
সেবার মনমানসিকতা :
ব্যবসাকে শুধু মুনাফা অর্জনের উপায় না ভেবে সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে হবে। জনগণ প্রয়োজনে যেন আপনাকে পায় সেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। প্রত্যেক গ্রাহকের সাথে আপনার সম্পর্ক হবে অত্যন্ত মধুর। আপনার আচার ব্যবহার মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারলে দেখবেন আপনার পরিচিতি বেড়ে যাবে। এতে দলে দলে সবাই কোনো পণ্যের জন্য প্রথমে আপনার কাছেই আসবে। অধিক মুনাফার জন্য অত্যধিক দামে পণ্য বিক্রির মানসিকতা পরিহার আবশ্যক। গ্রাহকদের প্রতি সহনশীল মানসিকতা ও অস্বচ্ছলদের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়াটা আবশ্যক।
ব্যবসার সম্প্রসারণ :
ব্যবসা শুরু করার পর যখন আপনার কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জিত হবে তখন আপনি আপনার ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করতে পারেন। এ সম্প্রসারণ হতে পারে আপনার দোকানে দ্রব্য বৃদ্ধি কিংবা দোকানের আয়তন বৃদ্ধি। আপনার ব্যবসার শাখা হিসেবে অন্য আরেকটি দোকানও দিতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনি আগের ব্যবসাই করতে হবে তা না। অন্য যেকোনো ধরনের দোকানও আপনি দিতে পারেন। ব্যবসার সম্প্রসারণে আপনি আপনার বন্ধু বান্ধব কিংবা ব্যাংক লোনও নিতে পারেন। আপনাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে দুটো প্রতিষ্ঠান যাতে একসাথে সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়। আবার আপনার দোকান সম্প্রসারণে বা অন্য ব্যবসায় আপনার লোক নিয়োগ করতে হতে পারে। আপনার বিশ্বস্তদের দ্বারা যেন ব্যবসা পরিচালিত হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।